মহাশ্বেতা দেবীর একান্ত সাক্ষাৎকার

লেখার টাকায় আমার সংসার চলেছে

মহাশ্বেতা দেবীর একান্ত সাক্ষাৎকার
ভারতের প্রথিতযশা সাহিত্যিক ও মানবাধিকার নেত্রী মহাশ্বেতা দেবী গত ২৯ জানুয়ারি ২০০৯ বাংলাদেশে এসেছিলেন দৃক আয়োজিত আন্তর্জাতিক ফটোপ্রদর্শনীর উদ্বোধন করতে। তিনি ২ ফেব্রুয়ারি বিকালে স্বদেশে ফিরে যান। ঢাকায় অবস্থানকালে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন, বাংলা একাডেমী বইমেলায় উপস্থিত হলে স্বয়ং প্রধান অতিথি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে বক্তব্য রাখতে আমন্ত্রণ জানালে তিনি মঞ্চে উপবিষ্ট হয়ে বক্তব্য রাখেন। যে ক’দিন ঢাকায় ছিলেন গুণগ্রাহী ভক্ত, পাঠক ও সাংবাদিকরা তাকে ঘিরে তোলে এক মুগ্ধময় পরিবেশ। ১ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় বিশিষ্ট এনজিও নেত্রী এরোমা দত্তের বাসভবনেও আয়োজিত হয় তাকে ঘিরে কবি-সাহিত্যিক, শিল্পী ও মানবাধিকার কর্মীদের এক মিলনমেলা। এখানে তিনিও গাইলেন, আর সবাইও গাইল গান। জমে উঠেছিল এক আনন্দালোকে-মঙ্গলালোকে পরিবেশ। এরই মাঝে বিশিষ্ট সাংবাদিক বেবী মওদুদ আলাপচারিতায় তার একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন। যুগান্তরের পাঠকদের কাছে তা তুলে ধরা হল।
বেবী মওদুদ : আপনার জন্ম ১৩ জানুয়ারি এবং ঢাকায় আপনি এ মাসেই এসেছেন। ঢাকার কোথায় কেটেছে আপনার শৈশব?
মহাশ্বেতা দেবী : হ্যাঁ। খুব ভালো লাগছে ভাবতে। ঢাকার লক্ষ্মীবাজারে আমাদের বাসা ছিল। পরে জিন্দাবাহার রোডে ছিলাম। সেই ১৯২৬ সালে আমার জন্ম হয়। আমার বাবা ছিলেন এসডিও। তার তো বদলির চাকরি ছিল। আমাদের পৈতৃক বাড়ি ছিল পাবনায়। ঢাকার ইডেন স্কুলের মন্টেশ্বরী ক্লাসে পড়তাম। আমাদের ছড়া, গান, নাচ শেখানো হতো। এটুকুই মনে আছে।
বে. ম. : এরপর কলকাতা চলে যান।
ম. দে. : হ্যাঁ, বাবা বদলি হয়ে গেলেন। তবে তিনি আমাকে রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতন স্কুলে ভর্তি করে দিলেন। তখনও রবীন্দ্রনাথ জীবিত ছিলেন। পরে আমি কলকাতায় এসে স্কুলে ভর্তি হই এবং ম্যাট্রিক ও আইএ পাস করি। আবার শান্তিনিকেতনে গিয়ে ইংরেজি সাহিত্যে বিএ অনার্স পড়ি। পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ পাস করি। আমার ২২ বছরে বিয়ে হয়ে যায়। অধ্যাপনা ও সাংবাদিকতার চাকরি করি। গল্প লিখতে শুরু করি। সংসার চালাতে এসব করতে হয়েছে। এখনও আমি বাংলা দৈনিক স্টেটসম্যানে কলাম লিখি। প্রথম কলাম লিখতাম দৈনিক বসুমতীতে। তারপর দৈনিক যুগান্তর ও দৈনিক বর্তমানে লিখলাম। লেখার টাকায় আমার সংসার চলেছে। এখনও চলছে।
বে. ম. : আপনি তো ইংরেজি সাহিত্যে লেখাপড়া করেছেন। বাংলায় সাহিত্য চর্চা করছেন?
ম. দে. : আমি ছোটবেলা থেকেই প্রচুর বাংলা বই যত পড়েছি ইংরেজি তত পড়িনি। শিক্ষার্জন যাই হোক, সাহিত্যচর্চা করাটাই হল কথা।
বে ম. : আপনার প্রথম লেখা বাঁশির রানী।
ম. দে. : হ্যাঁ, ওটাই প্রথম নাম করে। তারপর প্রচুর গল্প লিখেছি।
বে. ম. : আপনার ৫০টি গল্পের বইও আমি পড়েছি। আপনি নীচুস্তরের দরিদ্র, খেটে খাওয়া, নিপীড়িত, নির্যাতিত মানুষের দুঃখ-দুর্দশাকে তুলে ধরেছেন।
ম. দে. : হ্যাঁ, চেষ্টা করেছি। ওদের অসহায়ত্ব আমাকে কষ্ট দিত। সাংবাদিকতার কারণে ওদের ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুযোগ পেয়েছি। আমি খুব তথ্য রাখতাম। ফলে লিখতে সমস্যা হতো না।
বে. ম. : এই উপমহাদেশের মানুষের দুঃখ-কষ্ট, অভাব-অনটন-দারিদ্র্য আমরা তো যুগে যুগে দেখে আসছি। এটা আজও ঘুচছে না কেন? মানুষ খেয়েপরে ভালো থাকার সুযোগ পাচ্ছে না কেন? এর জন্য দায়ী কে? রাজনীতি না রাষ্ট্রনায়করা?
ম. দে. : সম্পূর্ণভাবে তারাই ব্যর্থ। এই ধর, পশ্চিমবঙ্গে ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ বছর ধরে মার্কসবাদীরা কমিউনিস্ট পার্টি। চার বছর আগে পুরুলিয়ার কাছে একটি আদিবাসী এলাকায় ছয় শত আদিবাসী মানুষ মারা গেল শুধুমাত্র অনাহারে। সরকারি ব্যর্থতা এটা। অবশ্য এর আগে সুপ্রিমকোর্টে রাইট টু ফুড এন্ড রাইট টু ওয়ার্ক মামলা করেছিল। রায়ে বলা হয়েছিল, দুর্ভিক্ষ ও দরিদ্র অবস্থার নিচে যারা রয়েছে তাদের বিনা পয়সায় চাল, গম, ডাল দেয়ার কথা। কেন্দ্রীয় সরকার পাঠিয়েও ছিল হাজার হাজার কুইন্টালস চাল-গম। সেগুলো সরকারিভাবে বিভিন্ন দফতরের মাঝে বণ্টন হল। কিন্তু যাদের জন্য এলো তারা পেল না। লাল রঙের বিপিএল কার্ড দেয়া হয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গে রাস্তা, বিদ্যুৎ, পানির খুব কষ্ট। কথা ছিল একশ’ দিন কাজ করতে হবে এবং ওইসব খাদ্য তাদের দিতে হবে। তার জন্য টাকাও দেয়া হয়েছিল। কিন্তু কারও কাছে কিছু পৌঁছল না। ফলাফল হল মানুষ না খেয়ে মরেছে। একেবারে নীচুস্তরের মানুষ যারা তাদের বঞ্চিত রাখা হবে কেন? তারাও তো মানুষ?
বে. ম. : আমাদের এখানে কাজের বিনিময় খাদ্য, ভিজিএফ কার্ড বিতরণ কর্মসূচি আছে।
ম. দে : আমাদের ওখানেও আছে। কিন্তু কাজ করতে হবে, দেখতে হবে। সেটা তো হচ্ছে না। ফলে মানুষ অনাহারে মরছে।
সরকার অনেক আইন করে। সেই আইনগুলো তো কার্যকর হয় না। সেগুলো বাস্তবায়ন হলেও অনেক ভালো হতো। এটা তো সরকারের দায়িত্ব। অ্যাক্ট করলেই তো হবে না, তা কার্যকর করাটাও জরুরি।
বে. ম : আপনার উপন্যাস হাজারী চুরাশির মা এবং রুদালি চলচ্চিত্রে রূপায়িত হয়েছে। আপিন কেমন উপভোগ করেছেন?
ম. দে. : আমি যখন লিখেছি তখন তো আমার চিন্তা-চেতনা থেকে লিখেছি, সেখানে আমার স্বাধীনতা ছিল। আর যখন চলচ্চিত্র হয়েছে তখন তার নির্মাতারও একটা স্বাধীনতা থাকতে হবে। আমি সেটা স্বীকার করি। তবে আমার ভালো লেগেছে।
বে. ম. : এখন তো সায়েন্স ফিকশন অত্যন্ত জনপ্রিয়। কমিকস, রহস্য কাহিনীও প্রকাশিত হয়। আপনি কি পড়েন? কেমন লাগে?
ম. দে. : এখন তো বেশি পড়তে পারি না, প্রয়োজন অনুযায়ী পড়ি। পাঠক যদি পছন্দ করে, তাহলে নিশ্চয় এগুলো জনপ্রিয় হবে। যার যা ভালো লাগে তাই পড়ার স্বাধীনতা থাকা উচিত।
বে. ম. : আপনার লেখা শব্দ, ভাষা ও স্টাইল সাধারণ পাঠকের কাছে বেশ কঠিন মনে হয়। সিরিয়াস পাঠক ছাড়া আপনার সাহিত্য বোঝা খুব কঠিন। আপনি কখনও এসব ভেবেছেন?
ম. দে. : আমি যা শিখেছি, জেনেছি তাই লেখার মধ্যে ব্যবহারের চেষ্টা করেছি। সেখানে কেউ বুঝতে না পারলে, আমার কিছু করার নেই। আমি যা পারি তাই লিখেছি, লিখে যাচ্ছি।
বে. ম. : আপনাকে বলা হয়ে থাকে লেখকের লেখক। এটা স্বীকার করেন?
ম. দে. : কি করে বলব, আমি নিজেই যে লেখক।
বে. ম. : আপনি তো ঊনবিংশ-বিংশ শতাব্দীর মানসিকতায় গড়ে উঠেছেন, জীবনযাপন করেছেন। এখন একুশ শতাব্দীতে আপনার উপলব্ধি-
ম. দে. : আমার বয়স চুরাশি বছর। স্বাভাবিকভাবেই আমাকে মানিয়ে চলতে হয়েছে। তবে আমি তো আমার মতোই জীবনযাপন করেছি। কাজও করছি- কোন সমস্যা হয়নি। এটা হল নিজের বোধের উপলব্ধি।
বে. ম. : এই প্রজন্মের প্রতি কোন উপদেশ?
ম. দে. : পড়, কাজ কর, সবাইকে আপন ভাব।
বে. ম. : আপনি আদিবাসী নিয়ে কাজ করছেন এখনও?
ম. দে. : হ্যাঁ, ওদের শিক্ষা ও চাকরির ব্যবস্থা করতে হয়। তারপরও সবার জন্য কাজ করি। সিঙ্গুরের কৃষিজমি যখন শিল্প প্রতিষ্ঠায় সরকার নিয়ে নিচ্ছিল সেখানেও কাজ করেছি। আবার গুজরাটে যখন দাঙ্গা হল, তখনও সেখানে গিয়েছি। মানুষকে সচেতন করার কাজ করেছি। আমার মনে হয় মানবাধিকারের ব্যাপারে মেয়েরা অনেক বেশি সচেতন। তারা সবাইকে সাহায্য করে। এক জায়গায় রান্না হচ্ছে, খাওয়াচ্ছে আবার প্রতিবাদও করছে। এসব দেখে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিশ্চয় আশা করতে পারি। যতই নিপীড়ন, নির্যাতন, বৈষম্য আসুক- একদিন রুখে দাঁড়াবে তারা।
বে. ম. : আপনি কি মনে করেন একজন লেখক ও বুদ্ধিজীবী হিসেবে সমাজ-মানুষের কাছে আপনার কিছু দায়বদ্ধতা আছে? সবার এটা থাকা উচিত।
ম. দে. : অন্যদের কি আছে জানি না, তাদের চিন্তাভাবনা কতটুকু জানি না। কিন্তু আমি তো করে যাচ্ছি অনেকদিন থেকে। থাকা উচিত কিনা জানি না, তবে যার যার মূল্যবোধ থেকে গড়ে ওঠে।
বে. ম. : আমি আখতারুজ্জামান ইলিয়াস ও হাসান আজিজুল হকের লেখা পড়েছি। অনেক উঁচুমানের লেখক তারা। তাদের জীবনবোধ আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে। আরও অনেকের লেখা পড়েছি। এবারেও অনেকের বই পেলাম। বই ছাড়া আমার আর কি বিষয় হতে পারে বল?
সবশেষে মহাশ্বেতা দেবী বললেন, বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ হল। অনেক কথা হল তার সঙ্গে। খুবই আন্তরিক ও দৃঢ় চেতার মানুষ। তাকে বলেছি, তোমাকে দরিদ্র ও নিঃগৃহীত মানুষের জন্য কাজ করতে হবে। তিনি তার গত সরকারের অনেক কর্মসূচির কথা বলেছেন। এবারও তিনি অভাবী ও নিঃগৃহীত মানুষের জন্য কাজ করবেন বলে আমরা আশা করি। আমরা তাকে প্রধানমন্ত্রী হতে দেখে খুব খুশি। আমরা তার দিকে তাকিয়ে আছি। তাকে আশীর্বাদ করছি।
একুশের বইমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে থাকতে পেরে তিনি খুব খুশি। গৌরবান্বিত বোধ করলেন। বললেন, এই বইমেলার কথা তো শুনেছি। আজ নিজে উপস্থিত হতে পেরে খুব খুশি আমি। সবার বক্তব্য ভালো লেগেছে। সবাই তো প্রাণের মানুষ। তাই প্রাণের কথা বলতেই পারেন। বইমেলা সারাবিশ্বে আজ সমাদৃত। পশ্চিমবঙ্গে প্রত্যেক জেলায় বইমেলা হয়ে থাকে। মানুষ তো সাংস্কৃতিক জীব। এবার এসে খুব আনন্দ পেলাম।
মহাশ্বেতা দেবীকে আমরা একজন জীবনবোধমনস্ক লেখিকা হিসেবে চিনি। তার লেখা বই ভারতের বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ হয়েছে। অনেক পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। পিতা মনীশঘটক নামকরা সাহিত্যিক, ছোট ভাই ঋত্বিকঘটক বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার। স্বামী বিজন ভট্টাচার্য একজন খ্যাতনামা অভিনেতা ও চিত্রনাট্যকার ছিলেন। ভারতের একজন সর্বজনশ্রদ্ধেয় বুদ্ধিজীবী হিসেবে মহাশ্বেতা দেবী আজ প্রতিষ্ঠিত। তিনি কখনও শক্তি, ক্ষমতা ও অর্থের কাছে আপস করেননি বলেই জীবনযাপনে অত্যন্ত সরল-সাধারণ। তবে তিনি গরিব, নিগৃহীত, নিপীড়িত মানুষের বিশ্বস্ত বন্ধু এবং হূদয়বান ব্যক্তিত্ব।
ঢাকা-৪ ফেব্রুয়ারি ২০০৯

0 comments:

Post a Comment