নির্ঝরের ‘নমুনা’

নির্ঝরের ‘নমুনা’ নিয়ে সেন্সর বোর্ডের নমুনা

খবরটি একই সঙ্গে বিস্ময়ের, বেদনার। বিস্মিত হতে হয় যখন এনামুল করিম নির্ঝরের মতো একজন দায়বদ্ধ ও রুচিবান নির্মাতার ছবি সেন্সর বোর্ড আটকে দেয়। আবার সেই ছবিটি যদি হয় সরকারি অনুদানের ছবি! অনুদানের ছবির স্ক্রিপ্ট তো আগেই জমা দেয়া হয়, তারপর অনুদান। তাহলে আগে এক, পরে আরেক- এ আচরণ কেন? সরকারের এই দ্বৈত আচরণে বিস্ময় তো স্বাভাবিক।

দেশে গণতান্ত্রিক সরকার। অথচ অগণতান্ত্রিক আচরণ! সৃজনশীলতা, মুক্তা চিন্তা, মতপ্রকাশের  স্বাধীনতার বাধা- এমনটি এই সরকারের সময় ভাবা যায় না। কেননা এই সরকার মুক্ত চিন্তার সরকার। কঠোর ও কট্টরপন্থী নয়। ফলে এই সময় এসে সেন্সরবোর্ডের অমানবিক আচরণ, সৃজনশীলতায় বাধা- ভাবতেও কষ্ট হয়।

এনামুল করিম নির্ঝরের পরিচয় নতুন করে দেয়ার ন্যূনতম প্রয়োজন নেই। ‘আহা!’ দেখার পর দর্শকের ‘আহা’ অভিব্যক্তিটিই প্রমাণের জন্য যথেষ্ট নির্ঝর কেমন নির্মাতা। নির্ঝরের নাম শুধু দেশে নয়, বাইরেও বিস্তৃত ‘আহা!’র কারণে। ‘আহা!’র ফলে অস্কার শব্দটি উচ্চারিত হতে পেরেছে- এ সম্মানও তো কম নয়। দেশে, দেশের বাইরে ‘আহা!’র খ্যাতি ও জনপ্রিয়তা আমরা দেখেছি। সেই খ্যাতি, সম্মান, জনপ্রিয়তার কেন্দ্র এনামুল করিম নির্ঝর। সেই পরিচালক বা নির্মাতা যখন তার পরবর্তী ছবিটি বানাবেন, তখন তা শিল্পের মান বিচারে আরও উৎকর্ষতার পরিচয় যে দেবে বা দিয়েছে তা তো এমনিতেই বোঝা যায়। বুঝতে বা বোঝাতে কষ্ট হওয়ার কথা নয় কারও। ফলে ‘নমুনা’র ক্ষেত্রে কথাগুলো যে চরমতম সত্য তা বোঝাবারও প্রয়োজন নেই। কারণ এনামুল করিম নির্ঝর নিজেই প্রমাণিত।

সেন্সরবোর্ডের ‘নমুনা’ নিয়ে নানা আপত্তি। সেন্সরবোর্ড চায় নমুনার অযৌক্তিক, অন্যায় অস্ত্রপ্রচার। অবশ্য সেন্সরবোর্ডের সুস্থতা নিয়ে আগেও অনেক প্রশ্ন উঠেছে এবং তা অমীমাংসিতই থেকে গেছে। ‘নমুনা’য় এমন কী আছে যা সমাজের জন্য নেতিবাচক। কী কারণে সেন্সরবোর্ডের এই আক্রমণ। এত ভয়। যা জানা গেছে, তা হলো ‘নমুনা’ নিতান্ত মানবিক একটি দৃশ্যকাব্য। সমাজের চলমান একটি চিত্র। ভেজাল সমাজে যখন কোনো অবুঝ শিশু গুলিবিদ্ধ হয়- তখন কার কি আসে যায়? পৃথিবীর পোড়খাওয়া অংশে ভাগ্যহত কতইনা শিশুকে মেনে নিতে হয় এমন নিয়তি প্রতিদিন, আমরা দায়ী করব কাকে? ক্ষমতা, লোভ, প্রতিহিংসা দেখতে দেখতে অভ্যস্ত মানবকুল তাদের জীবনযাত্রায় তখন শাসকের তামাশা আর লীলাখেলা দেখে বাস্তব আর আকাঙ্ক্ষার তফাৎ বুঝে আমাদের অসহায় বোকা চোখ তবু বার বার আশার আলো খুঁজতে চেষ্টা করে। কিন্তু যখন নিজেদের কাছে নিজেরাই অচেনা; তখন সামান্য নমুনাই সান্ত্বনা হয়ে ওঠে। সেই নমুনা চিত্রটি ইতিবাচকতার ইঙ্গিত দেয়। ঐক্যের কথা বলে। মুক্তির কথা বলে। সহিংসতার পথ পরিত্যাগ করে, সম্মিলনের কথা বলে। একটা মফস্বল, একটা স্কুল... দ্বন্দ্ব। স্কুল নিয়ে দ্বন্দ্ব দুজনের মধ্যে। ক্ষমতার দ্বন্দ্ব দুজন নারীর মধ্যে। তাদের লোকজনের মধ্যে। অবশেষে মুক্তি...।

সেন্সরবোর্ড ‘কর্তন করিতে হইবে’ বলে একটি দৃশ্য তালিকা পরিচালক বরাবর পাঠিয়ে দেয় গত ফেব্রুয়ারি মাসে। সেখানে অনেক দৃশ্যের কর্তন নির্দেশ আসে। তার কয়েকটি নির্দেশের নমুনা এমন-

১. চলচ্চিত্রের সে সব দৃশ্যে দুই প্রধান নারী চরিত্রের পোশাক, সাজসজ্জা ও সংলাপ দেশের দুই নারী নেত্রীর আদলে উপস্থাপিত হয়েছে সেগুলো কর্তন করতে হবে।

২. মাসুম রহমানের সঙ্গে তার স্ত্রীর জড়াজড়ি, দৃশ্য কর্তন হবে।

৩. ‘আল্লাহর মাল আল্লাহ নিছে’- লোকমানের সংলাপ কর্তন করতে হবে।

৪. ‘উনাদের স্বামী, ফাদার দুজনই তো আল্লাহর কাছে চলে গেছে’- জুনায়েদের সংলাপটি কর্তন করতে হবে।... এই দৃশ্য তালিকা দীর্ঘ।

৫.‘বুঝেছো মানুষ রাজাকাররেও মাফ করে’ -সংলাপটি কর্তন করতে হবে।

৬. ধর্মীয় পোশাক সম্বলিত জুলেখার শটগুলো কর্তন করতে হবে।

৭. আলতাফের সংলাপ ‘আরে দিন দুনিয়ার খবর রাখেন? বুশ যে সাদ্দামের কবরে আসা... থেকে... প্লেনে নিয়ে যাব, আবার পৌঁছাইয়া দিব’ পর্যন্ত কর্তন করতে হবে।



অনুদানের ছবির চিত্রনাট্য আগেই জমা দেয়া হয়। চিত্রনাট্য অনুমোদনের পর অনুদান। সেই অনুমোদন কমিটিতে মুস্তাফা মনোয়ার, ড. আফসার আহমেদ এমন অনেক খ্যাতিমানরাই ছিলেন বলে জানা যায়। তখন তারা আপত্তি করেননি। এখন করছেন। কেন করছেন আর তখন কেনইবা করেননি তাও কৌতূহলোদ্দীপক। ড. আফসার আহমেদ তো এখনো কমিটিতে আছেন। তখনো ছিলেন। তখন তো প্রশংসার ঝড় তুলেই অনুমোদন দিয়েছিল কমিটি।

দুই নারী নেত্রীর কথা বলে যে অভিযোগ আনা হচ্ছে তা নিতান্ত সূক্ষ্মতা ছাড়া অন্য কিছু নয়। দুই নেত্রী ছবিতে এসেছে রূপক ও প্রতীকে। তাদের চারপাশের ঘূর্ণয়মান লোকজনও এসেছে স্বাভাবিকভাবেই। গত কয়েক বছরের দিকে যদি তাকাই তাহলে কয়েকটি শব্দ বা বাক্য পাওয়া যাবে- সামাজিক ও রাজনীতিকভাবে। তা হলো ‘সংস্কার’, ‘দিনবদল’, ‘বদলে যাও’ ইত্যাদি ইত্যাদি। সংস্কার কোনো অপরাধ নয়। যেকোনো কিছুরই সংস্কার প্রয়োজন। আজকে যে গণতান্ত্রিক সরকার বিপুল ভোটের মধ্য দিয়ে নির্বাচিত হয়েছে তা তো সংস্কারের কারণেই সম্ভব হয়েছে। দিনবদলও আমরা চাই। সেই লক্ষ্যে অঙ্গীকারও করেছি আমরা। আমরা চাই বদলে দিতে, বদলে যেতে। সেই বদল কোন বদল? অবশ্যই তা ভালো অর্থে, ইতিবাচক অর্থে। সেই অর্থে নির্ঝরের ছবিটি হতে পারে বদলে যাওয়ার মাইলফলক। কিভাবে বদলে যেতে হয় সেই কথাই তো আছে ছবিটিতে। কোনো বিদ্বেষ নয়, দুই নেত্রীর প্রতি, দেশের প্রতি শ্রদ্ধা ভালোবাসা না থাকলে এই নিরীক্ষাপ্রবণতা কারও পক্ষে সম্ভব নয়। একজন দেশপ্রেমিক এনামুল করিম নির্ঝর তার দারুণ উদাহরণ হয়ে থাকবেন।

নির্ঝর গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেন। আমরা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি। সেই কারণেই নির্ঝর চেয়েছেন ‘নমুনা’ গণতান্ত্রিক সরকারের সময় আলোর মুখ দেখুক। কিন্তু ‘নমুনা’ নিয়ে সেন্সর বোর্ডের যে কর্তন তালিকার নমুনা ও অভিযোগ তার কোনোটাই গণতান্ত্রিক নয়। মানুষকে মুক্ত চিন্তা করতে দিতে হবে। গণতন্ত্রের চর্চা ততই সুসংহত হবে। ভৌত ভিত্তি আরও মজবুত হবে। তবেই মুক্তি, নয় তো নয়।



এনামুল করিম নির্ঝর যা বললেন

‘আহা!’র সাফল্যের পর অনেকেই বলেছেন ব্যবসা সফল বাণিজ্যিক ছবি করতে। আমি করিনি। দেশের জন্য, মানুষের জন্য ছবি করতে চাই। মানুষ যেন একটা ভালো অনুভূতি নিয়ে হল থেকে বাড়ি যায়। দেশটা আমাদের সবার। এই সহিংসতা, রক্তপাত আর কত। কিছু মানুষ সুযোগ নিচ্ছে। দুই নেত্রীকে আমরা দেখেছি কী দুর্ভোগ তাদের পোহাতে হয়েছে। এই দুর্ভোগ আমরা চাই না। কেউ চাই না। কারা তাদের দুর্ভোগের জন্য দায়ী যদি প্রশ্ন করি। কে উত্তর দেবে? তারা আমাদের মা, খালা, নানি দাদির মতো শ্রদ্ধার মানুষ। ভালোবাসা থেকে সংঘাত পরিহারের কথা বলেছি। শ্রদ্ধা থেকে বলেছি। আমি তো চাইলেই নির্বাচনের আগে ছবিটা দিতে পারতাম। কেউ কেউ চাইছিল ও সেটা কিন্তু এতে গণতন্ত্রের ক্ষতি হতো। আমি গণতন্ত্রে বিশ্বাসী সে কারণে তা করিনি। আমি চাই গণতান্ত্রিক সরকার তার উদারতা একটি মানুষকে জানান।

এই সরকার অনেক বেশি উদার ও গণতান্ত্রিক- এই বিশ্বাস আমার আরও দৃঢ় হোক। এই প্রত্যাশা আমার।



নমুনার গল্প, চিত্রনাট্য, গীত রচনা, পরিচালনা : এনামুল করিম নির্ঝর

প্রযোজনা : নাইন স্টেপস

সঙ্গীত পরিচালনা : দেবজ্যোতি মিশ্র

সম্পাদনা : জুনায়েদ হালিম

অভিনয় : কাফি খান, গুলশান আরা চম্পা, গাজী রাকায়েত, লুৎফর রহমান জর্জ, শামস সুমন, শাহির হুদা রূমী, আব্দুর রশিদ, শুভাশীষ ভৌমিক, ইরেশ যাকের, আরিফিন শুভ, সাকিবা, রূনা খান ও আরও অনেকে।

বিশেষ উপস্থিতি :

সহিদুল আলম সাচ্চু, আহমেদ মাযহার

গান গেয়েছেন : ফাহ্‌মিদা নবী, মিলন মাহমুদ, মেহ্‌রীন, সজীব, ওয়াকিল, প্রমা
শব্দ প্রযুক্তি : ডলবি ডিজিটাল সারাউন্ড ই এক্স

0 comments:

Post a Comment