Ticker

6/recent/ticker-posts

বালক পরিব্রাজক মুহাম্মদ ইউনূসের দিনলিপি

 

বালক পরিব্রাজক মুহাম্মদ ইউনূসের দিনলিপি

বিশ্বের নানা শহর, গ্রাম, পথ ও প্রান্তরে

বালক ইউনূসের দিনলিপি প্রসঙ্গে—৫৫ বছর পরের এক আবিষ্কার

হঠাৎ করেই পুরোনো ট্রাঙ্কের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল এই ডায়েরি। বিস্মিত হলাম—এত বছর পর! ছোটবেলায় যে আমি এমন এক বিশদ দিনলিপি লিখেছিলাম, সেটাই প্রায় ভুলতে বসেছিলাম। বিশ্ব স্কাউট জাম্বুরিতে ভ্রমণের সময় কিছু নোট নিয়েছিলাম, সেটা মনে ছিল। কিন্তু এটিকে কখনো ভ্রমণকাহিনি হিসেবে লিখেছিলাম—সে উপলব্ধি তখনো ছিল না।

মাত্র কয়েক মাস আগে আমার ছোট ভাই আইয়ুব চট্টগ্রামে পৈতৃক বাড়ির পুরোনো কাগজপত্র ঘাঁটতে গিয়ে এই ডায়েরি খুঁজে পেল। ৫৫ বছর পর যখন নিজেরই লেখা পড়তে শুরু করলাম, তখন এক নতুন অভিজ্ঞতা হলো। প্রতিটি শব্দের ভেতর দিয়ে অতীতের আমি যেন বর্তমানের আমার সামনে এসে দাঁড়াল। ১৫ বছর বয়সী বালক ইউনূসের সঙ্গে ৭০ বছর বয়সী ইউনূসের নতুন করে পরিচয় হলো।

১৯৫৪ সালের কথা। আমি তখন চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্র, স্কাউট ট্রুপের লিডার। অষ্টম বিশ্ব জাম্বুরি হতে যাচ্ছে কানাডায়, আর স্কুল আমাকে প্রতিনিধিদলে মনোনীত করল। ঢাকায় গিয়ে পরীক্ষা দিলাম। পূর্ব পাকিস্তানের চিফ স্কাউট কমিশনার আজিজুল হক প্রশ্ন করলেন, “তুমি কেন বিশ্ব জাম্বুরিতে যেতে চাও?” নানা যুক্তি দিলেও একটাই কথা বলেছিলাম—ফিরে এসে ভ্রমণকাহিনি লিখব, যাতে অন্য স্কাউটরা বিশ্ব জাম্বুরি সম্পর্কে জানতে পারে।

১৯৫৫ সালে ম্যাট্রিক পাস করলাম, ভালো ফল করায় চট্টগ্রাম কলেজে ভর্তি হলাম। ক্লাস তখনো শুরু হয়নি, এমন সময় খবর এল—প্রথমে করাচি যেতে হবে, সেখানেই হবে চূড়ান্ত নির্বাচন, তারপর কানাডা।

আমাদের ২৭ জনের দল গঠন করা হলো—পুরো পাকিস্তান থেকে বাছাই হলেও পূর্ব পাকিস্তান থেকে সুযোগ পেল মাত্র তিনজন, বাকি ২৪ জন পশ্চিম পাকিস্তানের। পরিকল্পনা হলো, জাম্বুরি শেষে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্য ঘুরে ইরান হয়ে পাকিস্তানে ফেরা হবে, জার্মানি থেকে কেনা তিনটি মাইক্রোবাসে।

কিন্তু আমার এই যাত্রা সম্ভব হতো না, যদি না আমার বাবা হাজি দুলামিয়া সওদাগর অকুণ্ঠ সমর্থন দিতেন। ভয় নিয়ে তাঁর কাছে অনুমতি চাইলাম। তিনি জানতে চাইলেন, কতদিনের সফর, পড়াশোনার কী হবে। সব বুঝিয়ে বলার পর শুধু বললেন, “যদি মনে করো এটা ভালো, তবে যাও।”

সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর তিনি আর পিছু হটেননি। ভ্রমণের প্রতিটি মুহূর্তে তিনি আমার পাশে ছিলেন। ইউরোপের পথে দুর্ঘটনার খবর শুনে উদ্বিগ্ন হলেও আতঙ্কিত হননি। করাচি থেকে মুম্বাই হয়ে কলকাতা হয়ে দেশে ফেরার পরিকল্পনাও তিনি উৎসাহ দিয়েই গ্রহণ করলেন।

আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, ডায়েরিটি মূলরূপেই প্রকাশিত হবে। ১৫ বছর বয়সী ছেলেটির দৃষ্টিভঙ্গি, অভিজ্ঞতা আর অনুভূতির সঙ্গে কারো হস্তক্ষেপ কাম্য নয়। শুধুমাত্র মুদ্রণের প্রয়োজনীয় সম্পাদনাই করা হয়েছে।

পাঠকদের প্রতি অনুরোধ—যদি কোথাও অস্পষ্টতা আসে, কোনো ঘটনা পরিচিত মনে না হয়, তবে এটুকু মনে রাখবেন, কখনো কলমহীন অবস্থায়, কখনো অনাহারে, কখনো গাড়ির হেডলাইটের আলোয় এই দিনলিপি লেখা হয়েছে। সবকিছু মেনে নিয়ে যদি কেউ ১৫ বছরের এক কিশোরের চোখ দিয়ে যুদ্ধোত্তর ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যকে দেখতে চান, তবে আপনাকে স্বাগত জানাই।

যদি অসম্পূর্ণতা থেকে থাকে, তার জন্য আমাকে নয়—বালক ইউনূস ও তার সময়কে দায়ী করবেন।

প্রথম আলোকে ধন্যবাদ, ঈদসংখ্যায় এই দিনলিপির কিছু অংশ প্রকাশের জন্য। আশা করি, পাঠকেরা আগ্রহী হয়ে উঠবেন পুরো ডায়েরিটি পড়ার জন্য।

মুহাম্মদ ইউনূস

২৮ জুন, ২০১০

Download ebook


Post a Comment

3 Comments

Rahul Bid said…
বই এ পাতার পর পাতা আমাদের বই ডট কম () লেখাটা কি খুব জরুরি ? পড়ার সময় বিরক্তি উৎপাদন করে... কথাটা একটু ভেবে দেখবেন দয়া করে... আপনাদের এই আসাধারণ কাজের মধ্যে এই কমতিটুকু না থাকাই বাঞ্ছনীয়...
Amarboi.com said…
বইটি অনেক আগের আপলোড, এখনকার নতুন বইগুলোতে এই ব্যাপকতা কম। আপনার মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ, ওয়াটারমার্ক এখন অনেক কমিয়ে দেয়া হয়েছে।
Rahul Bid said…
ধন্যবাদ । একটা বই এর অনুরোধ... অনুরোধের জন্য নির্দিষ্ট স্থানে অনুরোধ করতে অসফল হয়ে এখানে করছি।

"সময়ের জবানবন্দি"

হায়াৎ মামুদ

ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, বাংলাদেশ